চট্টগ্রামে ক্রমশই বাড়ছে জ্বর-ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা

রাজীব প্রিন্স :

টানা তাপপ্রবাহে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন। প্রখর রোদের তাপ, তীব্র গরম এবং অস্বস্তিকর আবহাওয়ায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকার মানুষ ডায়রিয়া, জ্বর ও সর্দি-কাশিতে ভুগছে।

- Advertisement -

শুধু চট্টগ্রাম নয়, সারাদেশেই গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা। দেশের কোথাও কোথাও তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে। ভ্যাপসা গরমে স্বস্তি মিলেছে না ঘরেও।

- Advertisement -google news follower

ছোট-বড় সবাই কাবু হচ্ছে গরমে। অনেক সময় আমাদের নিজেদের অজান্তেই দূষিত পানি ঢুকে যাচ্ছে পেটে, আর দেখা দিচ্ছে ডায়রিয়া। জ্বর ও ডায়রিয়ায় বেশি অসুস্থ হচ্ছে শিশুরা আর বয়স্করা রয়েছে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকিতে।

চট্টগ্রাম ও আশপাশের জেলাগুলোতে মৃদু তাপপ্রবাহের কারণে তাপমাত্রা প্রায় ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। সেইসঙ্গে বেড়েছে তাপপ্রবাহজনিত রোগের প্রকোপ।

- Advertisement -islamibank

এদিকে ঈদ ও পহেলা বৈশাখের ছুটি শেষে চট্টগ্রাম নগরে ফেরা মানুষের সংখ্যা যতই বাড়ছে, তাল মিলিয়ে গরমজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। ফলে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে ইতিমধ্যে শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে।

চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাধারণ সময়ের তুলনায় এখন হাসপাতালগুলোতে ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। রোগীদের অধিকাংশই শিশু।

চিকিৎসকরা বলছেন, কয়েক দিন ধরে অতিরিক্ত গরমের কারণে পানির চাহিদা বেড়েছে। অনিরাপদ পানি ও খাবার গ্রহণের কারণে ডায়রিয়া ছড়িয়ে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়রিয়া পানিবাহিত রোগ। দূষিত পানি পান করার মাধ্যমে এ রোগ হয়। সাধারণত দিনে তিন বা এর চেয়ে বেশি বার পাতলা পায়খানা হতে শুরু করলে তার ডায়রিয়া হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায়।

গরম এলেই ডায়রিয়ার সমস্যা মারাত্মক আকার ধারণ করে। বিশেষ করে শিশু-কিশোররা এই রোগে বেশি ভুক্তভোগী হয়।

তাদের মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শহরে টেপের পানি সেপটিক ট্যাংক বা সুয়ারেজ লাইনের সংস্পর্শে দূষিত হয়। অস্বাস্থ্যকর ও অপরিচ্ছন্ন জীবনযাপন, যেখানে-সেখানে ও পানির উৎসের কাছে মলত্যাগ, সঠিক উপায়ে হাত না ধোয়া, অপরিচ্ছন্ন উপায়ে খাদ্য সংরক্ষণ এবং ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে এ সময় দোকান, রেস্তোরাঁ বা বাসায় পচন ধরা ফ্রিজের খাবার গ্রহণ ডায়রিয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়।

সোমবার (১৫ এপ্রিল) রাতে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে দেখা গেছে, অনেকে এসেছে জ্বর, সর্দি, হাঁচি-কাশি নিয়ে। বেসরকারি রয়েল হাসপাতালেও একই চিত্র দেখা গেছে।

হাসপাতালের চিকিৎসকরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন, রমজানে রাস্তার পাশে কেনা খাবার খাওয়া এবং অনিরাপদ পানি পান করায় হয়তো ডায়রিয়া বেড়েছে।

এর আগে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, জরুরি বিভাগে লম্বা লাইন। তীব্র গরমে গাদাগাদি করে দাঁড়ানো আরও অস্বস্থিকর হয়ে উঠেছে। অসুস্থ শিশুদের নিয়ে বিপাকে অভিভাবকরা। কারও কারও সেবা নিতে ঘণ্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

কথা হয় পটিয়া জঙ্গলখাইন থেকে ৩ বছরের অসুস্থ শিশু নাজমাকে নিয়ে আসা অভিভাবক লাইলা বেগমের সাথে। তিনি জানান, গত এক সপ্তাহ ধরে পাতলা পায়খানার সঙ্গে জ্বর দেখা দেয় তার শিশুকন্যা নাজমার।

স্থানীয় ফার্মেসি থেকে জ্বরের ওষুধ এনে খাওয়ানো হয়ে তাকে। এরপর সামান্য জ্বর কমলেও পাতলা পায়খানা না কমায় আবারও জ্বর আসে তার। সঙ্গে পাতলা পায়খানা।

এভাবে থেমে থেমে চলতে থাকে। এরমধ্যে চিকিৎসকের পরামর্শে চিকিৎসা নিলেও অবস্থা দিন দিন খারাপ হতে থাকে শিশু নাজমার। নিরুপায় হয়ে অবশেষে চিকিৎসা নিতে ছুটে আসি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এখানে এসেও অসুস্থ শিশু কণ্যাকে নিয়ে জরুরি বিভাগের দীর্ঘ লাইনে দাড়িয়ে অপেক্ষা করছি সিটের আসায়।

হাটহাজারীর বাসিন্দা অলক ধর জানান, তাঁর ৫ বছর বয়সী সন্তান জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে দু’দিন আগে। তাকে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গিয়েছিলেন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদেরকে জানালেন শিশু চিকিৎসক ছুটিতে। তাই বাধ্য হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন। এখানেও সেবা পেতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের একজন নার্স বলেন, ঈদের ছুটি শেষ হলেও এখনও সব চিকিৎসক হাসপাতালে এসে পৌছায়নি। ফলে রাতের বেলায় হাসপাতালের শত শত রোগীর ভরসা জরুরি বিভাগের চিকিৎসক। তাই একটু চাপ বেড়েছে।

শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সুমন বিশ্বাস বলেন, ঋতু পরিবর্তন ও বায়ুদূষণজনিত কারণে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। শিশুদের অনেকে আসছে সর্দি, নাক বন্ধ হওয়া ও হাঁচি-কাশি নিয়ে। কারও কারও তীব্র জ্বর, গলাব্যথা ও কাশি। অন্য সময়ের চেয়ে রোগী বেড়েছে।

বসন্তের শেষের দিকে এবং গ্রীষ্মের শুরুতে কিছু ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস সক্রিয় হয়ে ওঠে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘মানুষের মধ্যে জ্বর, কাশি, ডায়রিয়া ইত্যাদি রোগ ছড়ানোর জন্য এইসব অণুজীব দায়ী।

তিনি বলেন, দূষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে অণুজীবগুলি বেশিরভাগ রোগ ছড়ায়। তাই খাদ্য ও পানীয় জল গ্রহণে মানুষকে সতর্ক থাকতে হবে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. অনিরুদ্ধ ঘোষ বলেন, যেহেতু গরমটা বেশি, স্বাভাবিকভাবে মানুষ বেশি তৃষ্ণার্ত ও পিপাসার্ত থাকে।

আমাদের পরামর্শ হলো যেসব ছোট বাচ্চা বুকের দুধ খায়, তাদের অবশ্যই বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। এটি বাচ্চাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। তাছাড়া বাইরের খাবারদাবারে বিশুদ্ধ পানির ব্যবহার খুবই কম হয়, যার কারণে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

বড়দের মধ্যে যারা বাইরে কাজ করেন তাদের বেশিরভাগই গরমে পিপাসা মেটাতে বাইরের বিভিন্ন শরবত ও খোলা পানি পান করেন। তাদের ক্ষেত্রে পরামর্শ হলো, বাইরের এসব খোলা পানীয় শরবত কোনোভাবেই খাওয়া যাবে না। বাইরে কাজ করতে হলে অবশ্যই বাসা থেকে বিশুদ্ধ পানি বোতলে করে সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে।

এছাড়া, প্রচণ্ড গরমের সময় হিট স্ট্রোক হলো আরেকটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা। বিশেষ করে, বয়স্ক ব্যক্তিরাই এ রোগে বেশি আক্রান্ত হন। তাই সরাসরি সূর্যের নিচে যাওয়া উচিত নয় এবং যদি কেউ হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হয় অবিলম্বে তার চিকিৎসা শুরু করার পরামর্শ দেন এ চিকিৎসক।

জেএন/রাজীব প্রিন্স

KSRM
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জয়নিউজবিডি.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন news@joynewsbd.com ঠিকানায়।

এই বিভাগের আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ

×KSRM