আত্মহত্যার চেষ্টা নাকি ফাঁসানোর চেষ্টা

0

পটিয়া প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (পিটিআই) প্রশিক্ষক দেবব্রত বড়ুয়া গত ৭ মার্চ ফেসবুক স্ট্যাটাসে  চার  সহকর্মীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ  উল্লেখ করে  আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। ঘটনাটি ভাবিয়ে তোলে সচেতন মহলসহ প্রশাসনকে। কয়েকটি সংবাদমাধ্যম গুরুত্বের সঙ্গে সংবাদটি প্রচার করে। এরপর ঘটনা তদন্তে তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগের উপ-পরিচালকের কার্যালয় থেকে একটি এবং চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়। এছাড়া বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) স্থানীয় সংসদ সদস্যের নির্দেশে উপজেলা চেয়ারম্যানকে প্রধান করে গঠন করা হয় আরও একটি কমিটি।

তবে প্রাথমিক অধিদপ্তরের তদন্ত কমিটি প্রশিক্ষণার্থীর সঙ্গে কথা বলে যৌন হয়রানির কোনো অভিযোগ পাননি বলে জানিয়েছে।

প্রশিক্ষক দেবব্রত বড়ূয়া ফেসবুকে স্ট্যাটাস হিসেবে দেওয়া খোলা চিঠিতে অভিযোগ করেন, “পটিয়া পিটিআইর চারজন প্রশিক্ষক ভয়ংকর দুর্নীতিবাজ। এ ধর্ষক চক্রের হাত থেকে পিটিআইর বর্তমান ও  ভবিষ্যৎ প্রশিক্ষণার্থীদের একমাত্র প্রধানমন্ত্রীই রক্ষা করতে পারেন।”

স্ট্যাটাসে চার প্রশিক্ষককে অভিযুক্ত করা হয়। তারা হলেন- ফারুক হোসেন (শারীরিক শিক্ষা), জসিম উদ্দীন (সাধারণ), রবিউল ইসলাম (আইসিটি) এবং সবুজ কান্তি আচার্য্য (চারু ও কারুকলা)।

তবে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন বলছেন, ২০১১ সাল থেকে  পিটিআই ইন্সট্রাক্টর দেবব্রত বড়ুয়ার সঙ্গে প্রশিক্ষক সবুজ কান্তি আচার্য্য, জসীম উদ্দিন, ফারুখ আহমদ ও রবিউল ইসলামের মনোমালিন্য ছিল। এই মনোমালিন্যকে কেন্দ্র করে তাঁদের ফাঁসাতেই সাজানো হয় আত্মহত্যার নাটক। প্রশিক্ষণার্থী শিক্ষার্থীদের আবেগকে উসকে দিতেই দেবব্রত বড়ুয়া আত্মহত্যার নাটক সাজান বলে তাদের অভিযোগ।

এদিকে অভিযুক্ত প্রশিক্ষকরা বলছেন, পিটিআইতে শ্রেণি কার্যক্রম চলার সময় ছোট্ট লাইব্রেরি কক্ষে বসে থাকতেন দেবব্রত বড়ুয়া। সহকর্মীরা ক্লাসের বিষয়ে আলোচনা করতে ডাকলেও তিনি আসতেন না। তিনি সবসময় সহকর্মীদের সঙ্গে রাগ দেখাতেন।

বিষয়টি নিয়ে জয়নিউজ প্রতিবেদক মুঠোফোনে কথা বলেন বেশ কয়েকজন প্রশিক্ষণার্থীর সঙ্গে। তাদের কথায়, অভিযুক্ত ওই চার প্রশিক্ষকই শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বেশি শাসন করতেন। কখনো কখনো মিসবিহ্যাবও করতেন। তবে যৌন হয়রানি করার বিষয়টি কখনো চোখে পড়েনি।

তারা আরও জানান, ওই চার শিক্ষকদের অতিরিক্ত শাসনের কারণে কিছু প্রশিক্ষণার্থীর মধ্যে চাপা ক্ষোভ ছিল। এই ক্ষোভকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন দেবব্রত বড়ুয়া।

দেবব্রত বড়ুয়া ৭ মার্চ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। ওইদিন তিনি একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে বর্তমানে সুস্থ আছেন। তিনি আত্মহত্যার করার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেন- ৩০টি ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার  করবেন।

তবে তিনি চিকিৎসা নেওয়া হাসপাতালটির একটি সূত্র জানায়, দেবব্রত বড়ুয়া মাত্র ৬টি ঘুমের ওষুধ খেয়েছিলেন। যার কারণে ডাক্তাররা তাঁকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে রিলিজ দেন। কারণ ৬টি ঘুমের ওষুধ খেলে ওয়াশ করার প্রয়োজন পড়ে না।

পটিয়া পিটিআই সূত্রে জানা যায়, ২০১৮  শিক্ষাবর্ষের সামশু নামের এক প্রশিক্ষণার্থী প্রশিক্ষক দেবব্রত বড়ুয়াকে বলেন- আপনার ক্লাস বুঝি না। এ কথা শুনে দেবব্রত বড়ুয়া সঙ্গে সঙ্গে পিটিআইয়ে বর্তমান সুপারিনটেনডেন্ট তপন কুমার দাশকে অব্যাহতিপত্র দেন। কিন্তু সেই অব্যাহতিপত্র গ্রহণ করেননি সুপারিনটেনডেন্ট।

এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সুপারিনটেনডেন্ট তপন কুমার দাশ জয়নিউজকে বলেন, প্রশিক্ষক দেবব্রত বড়ুয়া একবার আবেগপ্রবণ হয়ে অব্যাহতিপত্র দেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি জোরালোভাবে কিছু বলেননি। তিনি একটু আবেগী ধরনের। কোনো সহকর্মীর সঙ্গে কথা বলতেন না, নিজের মতোই থাকতেন।

সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা বললেন…

ফেসবুক স্ট্যাটাসে প্রশিক্ষক দেবব্রত বড়ুয়া যেসব প্রশিক্ষণার্থীর নাম উল্লেখ করেন এর একজন নুসরাত জাহান। ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের প্রশিক্ষণার্থী নুসরাত জাহান জয়নিউজকে জানান, ২০১৯ সালে পিটিআইয়ের ফারুখ স্যার এমএড প্রশিক্ষণে ঢাকায় ছিলেন। তিনি আমাদের কোনো ক্লাস নিতে পারেননি। তবে ফারুখ স্যার যোগদান করেন ২০২০ শিক্ষাবর্ষে। ফারুখ স্যার  চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি আমাকে ফোন করে বলেন, স্কুল পর্যবেক্ষণ করবো। আমি জিজ্ঞেস করি, স্যার কখন আসবেন। উত্তরে তিনি বলেন, যোগাযোগ রাখিও।

এরপর ২৪ জানুয়ারি ফারুক স্যারকে আমি ফোন করে জিজ্ঞেস করি  আপনি কি আসবেন? উত্তরে ফারুখ স্যার বলেন, আমি  আসতে পারবো না, অন্য আরেকদিন আসবো। ২৭ জানুয়ারি মেলঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আসতে পারবে কি-না জানতে চান ফারুখ স্যার। তবে আমি মেলঘর সরকারি স্কুলে যায়নি। এরপর স্যারের সঙ্গে আমার দেখাও হয়নি- যোগ করেন নুসরাত।

এক প্রশ্নের জবাবে নুসরাত বলেন, পিটিআইয়ে প্রশিক্ষক সবুজ স্যার মাঝেমধ্যে  খারাপ ভাষায় কথা বলতেন। তবে কখনো গায়ে হাত দেননি। প্রশিক্ষক দেবব্রত স্যারের সব কথা সত্যি নয়।

২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের প্রশিক্ষণার্থী সাইফুল ইসলাম জয়নিউজকে বলেন,  পিটিআইয়ের প্রশিক্ষকদের এ ধরনের কোনো ঘটনা আমার চোখে পড়েনি। স্যাররা ক্লাসে আমাদের সঙ্গে কখনো রসাল কথা বলতেন, আবার কখনোও শাসন করতেন। প্রশিক্ষক দেবব্রত বড়ুয়া স্যার যেভাবে ফেসবুকে লিখেছেন সেইরকম কোনো ঘটনা আমি দেখিনি। তবে দেবব্রত স্যার খুবই আবেগী ছিলেন।

২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের প্রশিক্ষণার্থী প্রিয়াংকা জয়নিউজকে বলেন, তেমন কিছু বলতে পারবো না। তবে  কয়েকজন স্যার আমাদের সঙ্গে মিসবিহ্যাব করতেন। সেখানে শুধু মহিলা প্রশিক্ষক ছিলেন না, পুরুষ প্রশিক্ষকও ছিলেন। বিশেষ করে সবুজ স্যার মিসবিহ্যাব করতেন।

২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের প্রশিক্ষণার্থী ফারজানা ইসলাম বলেন, পিটিআইয়ে প্রশিক্ষকদের তেমন কোনো খারাপ আচারণ আমার চোখে পড়েনি। তাঁরা শুধু শিক্ষকের মতো আচরণ করতেন।

এক প্রশ্নের জবাবে ফারজানা বলেন, ফারুখ স্যার সপ্তাহে একদিন শুধু শারীরিক শিক্ষা এবং বাংলাদেশ বিশ্ব পরিচিতি ক্লাস নিতেন। উনার সঙ্গে তেমন দেখা হতো না।

চলতি বছরের প্রশিক্ষণার্থী মাশরুখাত ও স্বপন জলদাস  বলেন, তদন্ত চলছে, তাই কথা বলতে পারবো না।

সংশ্লিষ্টরা বললেন…

এ ব্যাপারে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তদন্ত কমিটির সমন্বয়ক চট্টগ্রাম প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের উপ-পরিচালক সুলতান মিয়া। যোগাযোগ করা হলে তিনি জয়নিউজকে বলেন, আমরা রোববার (৮ মার্চ) পটিয়ায় গিয়ে অভিযুক্ত চার প্রশিক্ষক এবং কয়েকজন প্রশিক্ষণার্থীর সঙ্গে কথা বলেছি। কোনো প্রশিক্ষণার্থী সরাসরি যৌন হয়রানির কথা বলেননি।

অভিযোগকারী দেবব্রত বড়ুয়ার আত্মহত্যা চেষ্টার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যৌন হয়রানির বিষয়টি তিনি পটিয়ার পিটিআইর সুপারকে কিংবা প্রশাসনকে জানাতে পারতেন। তিনি তা না করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। এখন চার প্রশিক্ষক দেবব্রতের বিরুদ্ধে আইসিটি আইনে মামলা করার অনুমতি চেয়েছেন।

প্রসঙ্গত, এ ঘটনার পর ওই অভিযুক্ত চার প্রশিক্ষককে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

জয়নিউজ/পিডি

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...