শূন্য থেকে শীর্ষে উঠা সুফি মিজানের হাতেই একুশে পদক

0

সহজ-সরল, বিনয়ী ও মিষ্টভাষী একজন মানুষ। এক কথায় ভীষণ মিশুক। কথা বলতে গেলেই কখনো উদাহরণ টানেন পাশ্চাত্যের জ্ঞানগুরুদের, কখনো ইসলামের কালজয়ীদের, কখনো বা মানবধর্মের মহামানবদের। নিজেও জীবনযাপন করেন সৎ ও সত্যতার নিরেট এক প্লাটফরমে। খুঁজে বেড়ান জীবনের মানে। মানুষটিকে কেউ ডাকেন সুফি সাহেব, কেউবা মিজান সাহেব।

পুরো নাম সুফি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। ‘পিএইচপি ফ্যামিলি’র প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান তিনি। ব্যবসার জগতে সফল এক কিংবদন্তি। জীবনের এই স্বর্ণশিখরে উঠে আসতে কম সংগ্রাম করতে হয়নি। তিনি এবার মনোনীত হয়েছেন একুশে পদকে।

কষ্টের শিক্ষা জীবন

স্কুল জীবন মোটামুটি শেষ হলেও কলেজ জীবনেই অনেকটা কষ্টের শুরু সুফি মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের। কলেজ জীবনে আর দশ জনের মতো বন্ধুদের সঙ্গে খুব একটা আড্ডাবাজির সুযোগ পাননি তিনি। ইন্টারমিডিয়েট পাস করেই চাকরি শুরু করেছিলেন। সারা দিন কাজ করতেন। সন্ধ্যা ৬টায় নাইট কলেজে গিয়ে বসতেন। সারা দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর রাত ১১টা পর্যন্ত ক্লাস করতেন। কেবল তাই নয়, ৪ মাইল হেঁটে বাড়ি ফিরতেন গভীর রাতে। এরপর নিজে হাতেই রান্নাবান্না করে খেতেন। আবার সকাল ৮টা থেকে অফিস। কাজের ফাঁকে ফাঁকেই টিউশনি ও নিজের লেখাপড়া করছেন। অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে সাংসারিক প্রয়োজনেই ছাত্র জীবন থেকে এমন কষ্ট করতে হয়েছে তাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যাচেলর ডিগ্রি নিয়েছেন তিনি।

ব্যাংকার থেকে ব্যবসায়ী

দাদা ছিলেন ব্যবসায়ী। পাটের ব্যবসা করতেন। সে সময় চার-পাঁচশ মণের কয়েকটা নৌকা ছিল তাদের। তার বাবাও ব্যবসা করতেন। কিছু খেত-খামারও ছিল। সেখানে ধান-পাট চাষ হতো। সুফি মিজানের ইচ্ছা ছিল শিক্ষক হবেন। কিন্তু তার বাবা বললেন, ‘তুমি ব্যবসা করবে।’  কিন্তু টাকা? তখন বাবা বললেন, ‘ইফ ইউ নো দি বিজনেস, মানি উইল রান আপ টু ইউ।’ তার পরও মাত্র ১০০ টাকা বেতনে চাকরি শুরু করেছিলেন সুফি মিজান। এখনকার হিসাবে মাত্র ১ ডলার ২০ সেন্টস। ইন্টারমিডিয়েট পাসের পরপরই ১৯৬৫ সালে সর্বপ্রথম তৎকালীন ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানে (বর্তমানে সোনালী ব্যাংক লিমিটেড) চাকরি নিয়ে চট্টগ্রাম গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে দুই বছর চাকরি করার পর ’৬৭ সালেই আরেকটি ব্যাংকে যোগ দেন। তবে স্বাধীনতার পরপরই চাকরি ছেড়ে দিলেন। তখন ব্যবসার জন্য তার মূলধন ছিল মাত্র ১ হাজার ৪৮৩ টাকা। এই মামুলি টাকা দিয়েই ব্যবসা শুরু করেছিলেন তিনি।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে ব্যবসায়ীর সংখ্যা অনেক কমে গেল। কেননা বেশিরভাগ ব্যবসায়ীই ছিলেন নন-বেঙ্গলি। যারা ইন্ডিয়া ও পাকিস্তান থেকে এসেছিলেন, তারাই ব্যবসা জানতেন। তৎকালীন আদমজী, বাওয়ানী, দাউদের মতো বড় বড় সব শিল্প কারখানাই ছিল তাদের।

স্বাধীনতার পর যখন তারা নিজেদের দেশে ফিরে গেলেন তখন ব্যবসা ক্ষেত্রে বিশাল একটি শূন্যতা তৈরি হলো। ঠিক এই সময়টাকে কাজে লাগালেন মিজানুর রহমান। বেশ কয়েক বছর ব্যাংকে কাজ করে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিশেষ করে এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট বিজনেসটা ভালো করে শেখার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। জেনেছিলেন কোন দেশে কোন জিনিস তৈরি হয়, কোন দেশের ভালো জিনিস কম দামে পাওয়া যায়, আবার নিজের দেশে কোন সিজনে কোন জিনিস ভালো দামে বিক্রি হয়। এসব কিছুর সম্যক ধারণা নিয়েছিলেন ব্যাংকে চাকরির সময়।

আর সে কারণেই দেশ-বিদেশ থেকে এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যবসার মাধ্যমে ব্যবসায়িক জীবন শুরু করেছিলেন মিজান সাহেব। প্রথম দিকে জাপান থেকে টায়ারটিউব, মিল্ক পাউডার, সুতা, পুরনো কাপড়, স্পেয়ার পার্টস, মোটর পার্টস প্রভৃতি আমদানি করতেন তারা। সেখানে সফলতার পর পরই ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে যান। এরপর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। পেয়েছেন একের পর এক সফলতা।

সমাজসেবায় একুশে পদক

ব্যবসার পাশাপাশি সমাজসেবায় চট্টগ্রামের মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন সুফি মিজানুর রহমান।  সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষাক্ষেত্রে নিরলসভাবে কাজ করছেন তিনি। এরই ফলস্বরূপ ২০২০ সালে সমাজসেবায় একুশে পদকে মনোনীত হয়েছেন সুফি মিজানুর রহমান।

জয়নিউজ/পিডি

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...