নৌকায় ভোট দেবেন, ওয়াদা চাই:চট্টগ্রামের জনসমুদ্রে প্রধানমন্ত্রী

0

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামবাসীর কাছে আগামী নির্বাচনে নৌকা মার্কায় ভোট চেয়েছেন। আজ রবিবার চট্টগ্রাম পলোগ্রাউন্ড ময়দানে আওয়ামী লীগের জনসভায় তিনি সবার কাছে ভোট চান।

শেখ হাসিনা বলেন, চট্টগ্রামের উন্নয়নে যা যা দরকার, আমাদের সরকার কাজ করবে। আমি আপনাদের দোয়া ও ভালোবাসা চাই। একই সঙ্গে আপনাদের কাছে ওয়াদা চাই, আপনারা আগামী নির্বাচনে আবারও নৌকায় ভোট দিয়ে আমাদের জয়যুক্ত করবেন। আপনারা যা চাইবেন, আমি তার চেয়ে বেশি দেব।’ এ সময় উপস্থিত জনতা হাত তুলে সমর্থন প্রধানমন্ত্রীর কথায় সায় দেন।

রিজার্ভ নিয়ে সমালোচনার প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, ‘অনেকে এখন রিজার্ভ নিয়ে সমালোচনা করছেন। অনেকে প্রশ্ন করেন, রিজার্ভ গেল কোথায়? আমরা তো রিজার্ভ অপচয় করিনি। মানুষের কল্যাণে কাজে লাগিয়েছি। জ্বালানি তেল কিনতে হয়েছে, খাদ্যশস্য কিনেছি। বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছি। করোনার টিকা ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করেছি। এসব কাজে রিজার্ভ থেকে খরচ করতে হয়েছে আমাদের। আমাদের সরকার রিজার্ভ রেকর্ড পরিমাণ বাড়িয়েছে। আর কোনো সরকার রিজার্ভ বাড়াতে পারেনি। পর্যাপ্ত রিজার্ভ হাতে রেখেই সব কাজ করছি আমরা। রিজার্ভের কোনো সমস্যা নেই, আমাদের সব ব্যাংকে পর্যাপ্ত টাকা আছে। সামনের দিনেও কোনো সমস্যা হবে না।’

আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, আগামী ১০ ডিসেম্বর বিএনপি ঢাকা নাকি দখল করবে, সরকারকে উৎখাত করবে।

তিনি বলেন, ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আমাদের মুক্তি বাহিনী ও মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। আত্মসমর্পণের আগে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বুদ্ধিজীবী হত্যা শুরু করে। ১০ ডিসেম্বর ইত্তেফাকের সাংবাদিক সিরাজ উদ্দিন হোসেনকে তুলে নিয়ে যায়। এ রকম বহু জনকে তারা তুলে নিয়ে যায়। এই ১০ ডিসেম্মবর থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বুদ্ধিজীবী হত্যা শুরু করেছিল। বাংলাদেশে আত্মসমর্পণ করতে হবে জেনে, এই দেশ যেন সামনে এগিয়ে চলতে না পারে সে কথা মাথায় রেখেই তারা এ ঘটনা ঘটায়।

চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা আওয়ামীলীগ আয়োজিত সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম নগর আওয়ামীলীগের সভাপতি মাহাতাব উদ্দিন চৌধুরী। নগর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাসির উদ্দিনের সঞ্চলনায় সমাবেশে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দরা উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, সেই ১০ ডিসেম্বর বিএনপির খুব প্রিয় একটা তারিখ। বোধ হয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পদলেহনের দোসর ছিল বলেই ১০ ডিসেম্বর তারা ঢাকা শহর নাকি দখল করবে। আর আওয়ামী লীগ সরকারকে উৎখাত করবে। আমি তাদের বলে দিতে চাই, খালেদা জিয়া ৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জনগণের ভোট চুরি করে ক্ষমতায় এসেছিল। আর ভোট চুরি করে ক্ষমতায় এসেছিল বলেই তাকে বাংলাদেশের মানুষ মেনে নেয়নি। সারা বাংলাদেশ ফুঁসে উঠেছিল।

এর আগে চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ড মাঠে আওয়ামী লীগের জনসভা শুরুর আগেই জনসভাস্থল নেতাকর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতিতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। জনসভা প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে আশপাশের এলাকায়ও মানুষের ঢল নেমেছে।

বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে প্রধামন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, আওয়ামী লীগ করে উন্নয়ন, বিএনপি করেছে লুটপাট। তারা গণতান্ত্রিক ধারা পছন্দ করে না। অথচ দেশে গণতন্ত্র আছে বলেই সার্বিক উন্নতি হচ্ছে। বর্তমান সরকার জনগণের সার্বিক জীবন মান বদলের জন্য কাজ করে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ৯৬ সালে তারা ভোট চুরি করে ক্ষমতায় এসেছিলো। এ কারণেই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সঙ্গে তাদের আঁতাত। আমরা কল্যাণ করি মানুষের উন্নয়নের জন্য। বিএনপি পারে মানুষ খুন করতে। গ্রেনেড মেরে, গুলি করে তারা মানুষ হত্যা করেছে। দেশের ৬৩ জেলায় তারা একযোগে বোমা মেরেছিলো বিএনপি। ক্ষমতায় থাকতে দুই হাতে লুটপাট করেছে। জনগণের সম্পদ পাচার করেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জিয়া যখন মারা যায় আমরা শুনেছিলোম পরিবারের জন্য তিনি কিছুই রেখে যাননি। এখটা ভাঙা সুটকেস ছাড়া কিছু ছিলো না। আমি প্রশ্ন রাখতে চাই, খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসেই কীভাবে সম্পদের পাহাড় গড়েছিলো। তারা কি জাদুর কাঠি পেয়েছিলো?

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘খালেদা জিয়ারা পারে মানুষ হত্যা করতে। আওয়ামী লীগ শান্তিতে বিশ্বাস করে। তাই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে জনগণ শান্তিতে থাকে। বিএনপির দুইটা গুণ আছে-ভোট চুরি আর মানুষ খুন।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি ভোট চুরি করে ক্ষমতায় এসেছিলো বলেই জনগণ তাদের মেনে নেয়নি। দেড় মাসের মাথায় খালেদা জিয়া পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। মনে রাখতে হবে যারা ভোট চুরি করে জনগণ তাদের মেনে নেয় না। ২০০১ এর নির্বাচনের পর হিন্দু বৌদ্ধ কেউ তাদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি।’

তিনি বলেন, ‌‘১৯৭৫ সালের পর যারা ক্ষমতায় এসেছিলো তাদের কারণেই বাংলাদেশ সামনের দিকে এগোতে পারেনি। আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় আসে তখন দেশের উন্নয়ন হয়। আমাদের কাজই হচ্ছে জনগণের সেবা করা। দেশে এখন গণতন্ত্র আছে বলেই দেশের উন্নয়ন হচ্ছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জিয়াউর রহমান যখন মারা যান, তখন নাকি ভাঙা সুটকেস আর ছেড়া গেঞ্জি ছাড়া আর কিছুই রেখে যাননি। আমার প্রশ্ন তার ছেলে হাওয়া ভবন খুলে হাজার হাজার কোটি টাকা কিভাবে পেলো?’

চট্টগ্রামের উন্নয়ন প্রসঙ্গে সরকার প্রধান বলেন, ‘আমরা ক্ষমতায় আসার পর চট্টগ্রাম আন্তর্জাাতিক বিমানবন্দর করে দিয়েছি। ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়ক ৪ লাইন করা হয়েছে। আমরা ৬ লাইন করে দেবো। কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন করে দিচ্ছি। আজ চট্টগ্রামে ৩৫টি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন এবং ৬টি প্রকল্পের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেছি। এগুলো চট্টগ্রামের মানুষের জন্য আমার আজকের উপহার।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আপনাদের সবার হাতে মোবাইল ফোন দিয়েছে আওয়ামী লীগ। বিএনপি’র আমলে একটি ফোন কিনতে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা লাগতো। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মোবাইল ফোন উন্মুক্ত করে দিয়েছে। সারাদেশের ডিজিটাল সেন্টার করে দিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‌দেশে একটি মানুষও গৃহহীন থাকবে না। একটি মানুষও ভূমিহীন থাকবে না। আমরা ৩৫ লাখ ঘর করে দিয়েছি। এই বিএনপি দিয়েছে কিছু? যারা এতিমের টাকা মেরে খায় তারা জনগণকে কিছুই দিতে পারে না।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৯৬ সালে আমরা যখন সরকার গঠন করি, আমাদের রিজার্ভ ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আমরা কষ্ট করে রিজার্ভ বাড়ালাম। ২০০১-এ খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এলো। সেটাও আমাদের গ্যাস বেচার মুচলেকা দিয়েই এসেছিল। ক্ষমতায় এসেই তারা কীভাবে মানুষ খুন করেছে। চট্টগ্রামে আমাদের এমন কোনো নেতা-কর্মী নেই যাদের ওপর তারা হামলা করেনি। তাদের হাত থেকে কেউ রেহাই পায়নি। এই হত্যা-খুন, এটাই তারা খুব ভালো জানে। সেটাই তারা করে গেছে। মানুষের জন্য তারা কোনো কাজ করতে পারেনি।

আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় আসে, মানুষের উন্নতি হয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, আমরা যখন দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসি মাত্র ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রিজার্ভ ছিল। আমরা সেটা বাড়িয়ে ৪৮ বিলিয়ন ডলার করি। করোনাকালে পৃথিবীর উন্নত দেশ, ধনী দেশ বিনা পয়সায় কাউকে ভ্যাকসিন দেয়নি কিন্তু বাংলাদেশে দিয়েছে। আমি দিয়েছি নগদ টাকা দিয়ে কিনে। আমাদের রিজার্ভের টাকা আমরা খরচ করেছি। বিনা পয়সায় খাদ্য দিয়েছি। বিশেষ প্রণোদনা দিয়েছি ব্যবসা-বাণিজ্য যাতে চলতে পারে। শ্রমিকদের বেতন তাদের হাতে পৌঁছে দিয়েছি। কৃষকদের প্রণোদনা দিয়েছি যাতে চাষবাস চলতে পারে। ওষুধ-ভ্যাকসিন কিনেছি। আমার দেশের মানুষকে বাঁচাতে হবে। এখনো আমরা করোনা ভ্যাকসিন ও টেস্টিং বিনা পয়সায় করি। আমাদের কাজই হচ্ছে জনগণের সেবা করা আর সেটাই আমরা করে যাচ্ছি।

অপারেশন ক্লিন হার্ট ২০০১-এ শুরু করল। আওয়ামী লীগ, যুবলীগের বহু নেতা-কর্মীদের অত্যাচার করে হত্যা করেছে। তারপর সেই অপরাধীদের ইনডেমনিটি দেওয়া হলো। যেভাবে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যার পর ইনডেমনিটি দেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দেওয়া হয়েছিল। আল্লাহর রহমতে, আপনাদের দোয়ায় আমরা ক্ষমতায় আসতে পেরেছি বলে সেই খুনীদের বিচার করতে পেরেছি। সেই খুনীদের সঙ্গে এখনো তাদের সখ্যতা আছে। ওই খুনী-দুর্নীতিবাজ এরাই এদের সঙ্গে চলে। ২০১৩-১৫ যেভাবে অগ্নি সন্ত্রাস করে যেসব মানুষকে হত্যা করেছে এর জবাব একদিন খালেদা জিয়া, তারেক জিয়াদের দিতে হবে; অগ্নি সন্ত্রাস করে কেন তারা মানুষ হত্যা করল। এর হিসাব মানুষ নেবে, বলেন তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের বিদ্যুৎ নিয়ে কিছু দিন কষ্ট হয়েছিল। ভবিষ্যতে আর হবে না ইনশাল্লাহ। তবে আপনাদের কাছে অনুরোধ, সাশ্রয়ী হতে হবে। বিদ্যুৎ ব্যবহার সীমিত করতে হবে। আপনারা জানেন না, এই শীতকালে ইংল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের কী অবস্থা। সেসব দেশের মানুষ গরম পানি পাচ্ছে না। তারা রুম হিট করতে পারছে না। এক রুমের মধ্যে সমস্ত পরিবার নিয়ে থাকতে হচ্ছে। দোকানে গেলে জিনিস কিনতে পারে না। হয়ত এক প্যাকেট জিনিসের বেশি একটি পরিবার কিনতে পারবে না। এমন অবস্থা তাদের। আমি বলতে চাই, বাংলাদেশে এই অবস্থা হবে না। আমরা মানুষের সবরকম সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত রাখব। কিন্তু আপনাদের সহযোগিতা চাই।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এখনও পৃথিবীর অনেক দেশ থেকে মজবুত। বিশ্বব্যাপী এখন খাদ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের অভাব। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি আমাদের দেশের মানুষ যাতে ভালো থাকে। বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে আর কেউ ছিনিমিনি খেলতে পারবে না। জামায়াত-বিএনপিকে দেশের মানুষ আর ক্ষমতায় দেখতে চায় না। আপনারা ভোট দিয়ে আবারও আওয়ামী লীগকে জয়যুক্ত করবেন।

সমাবেশ শুরুর আগে তিনি ২৯টি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন এবং ৬টি প্রকল্পের বিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করেন।

জেএন/এফও/এমআর

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...