বোয়ালখালীর বড় বাধা বাড়াবাড়ি

ভোটের মাঠে আ. লীগ-বিএনপি

0

কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ-পূর্ব পাড় ঘেঁষে বোয়ালখালী উপজেলার অবস্থান। চট্টগ্রাম জেলা সদর থেকে যার দূরত্ব প্রায় ১২ কিলোমিটার। বোয়ালখালী উপজেলা ও চট্টগ্রাম শহরের সংযোগ সেতুর নাম কালুরঘাট ব্রিজ। বোয়ালখালী নাম উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে এই সেতুর কথা মনে পড়ে। এই এলাকার জন্য সেতু একটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলেও একাদশ জাতীয় নির্বাচনে পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা কি জনতার সাথে সেতুবন্ধন হতে পারবে? প্রশ্নটির উত্তর খুঁজেছেন জয়নিউজের বোয়ালখালী প্রতিনিধি মো. শাহীনুর কিবরিয়া মাসুদ। আজ পড়ুন দক্ষিণ চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ এই সংসদীয় এলাকার ভোটের মাঠের খবর:

ঘনিয়ে আসছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। কোন দলের কোন প্রার্থী নির্বাচনে লড়বেন তা নিয়ে চলছে জল্পনা-কল্পনা। দলীয় মনোনয়ন পেলেই কোমড় বাঁধা প্রস্তুতি নেতাকর্মীদের মাঝে। আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৮ আসনে মনোনয়ন দৌঁড়ে নেমেছেন। বিএনপি নির্ভার একক প্রার্থী নিয়ে। জাতীয় পার্টি ও ইসলামী ফ্রন্টেরও একক প্রার্থী হবে বলে জানিয়েছেন নেতাকর্মীরা।

বিগত দুই সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এ আসনে জোটের প্রার্থীকে নৌকা প্রতীকে নির্বাচিত করেছিলেন। তবে এবার ভিন্ন সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে আশাবাদী আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের।

বিএনপিতে সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী ও দলের ভাইস চেয়ারম্যান এম মোরশেদ খান ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করবেন। তিনি যদি নির্বাচনে অংশ না নেন তবে বিকল্প হিসেবে প্রার্থী হবেন মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আবু সুফিয়ান অথবা সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এরশাদ উল্লাহ।

এছাড়া জাতীয় পার্টি এককভাবে নির্বাচন করলে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার সহসভাপতি আমান উল্লাহ আমান এ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী। জাতীয় পার্টির নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক ইসলামী ফ্রন্টের চট্টগ্রাম নগর উত্তরের সভাপতি নাইমুল ইসলামও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বোয়ালখালী উপজেলা ও চট্টগ্রাম নগরের পাঁচটি ওয়ার্ড (৩, ৪, ৫, ৬ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ড) নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-৮ সংসদীয় আসন। এখানে ভোটার রয়েছেন ৪ লাখ ৭০ হাজার ৭২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৩৯ হাজার ১৩৯ জন এবং মহিলা ভোটার ২ লাখ ৩০ হাজার ৯৩৩ জন। তবে এ আসনে বোয়ালখালী উপজেলার ভোটারের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ ভোটার নগরে।

পরপর দু’বার জোটের শরিক দল জাসদকে আসন ছেড়ে দেওয়ার পর এবার আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতা-কর্মীরা দল থেকে প্রার্থীর মনোনয়ন চাইছেন। গত ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে জাসদের মঈন উদ্দীন খান বাদল মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এমপি নির্বাচিত হন। এবারও তিনি নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন চাইছেন।

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মোসলেম উদ্দীন আহমদ, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এম রেজাউল করিম চৌধুরী, দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আবদুল কাদের সুজন এবং মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসির ছেলে শিল্পপতি মুজিবুর রহমান।

গত ২০০৮ সালে হারানো চট্টগ্রাম-৮ আসন পুনরুদ্ধারে মরিয়া বিএনপি। অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জড়িয়ে পড়া নেতাকর্মীরা বিরোধ মিটিয়ে এক কাতারে এসেছেন নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে। মোরশেদ খান কোনো কারণে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলে তারই রাজনৈতিক শিষ্য নগর বিএনপির সহসভাপতি আবু সুফিয়ান প্রার্থী হতে পারেন। এছাড়া নির্বাচনে প্রার্থী হতে আগ্রহ দেখিয়েছেন চট্টগ্রাম নগর বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এরশাদ উল্লাহ।

১৯৭৩ সালের পর আর এ আসনে জয়ী হতে পারেনি আওয়ামী লীগ। প্রায় তিন দশক পর ২০০৮ সালে জোটপ্রার্থীর হাত ধরে আসনটি ফিরে পায় দলটি। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন মহাজোটের প্রার্থী জাসদের কার্যকরী কমিটির সভাপতি মইন উদ্দীন খান বাদল নৌকা প্রতীকে নির্বাচিত হন।

২০১৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি আবারও নির্বাচিত হন। তবে টানা দুইবার বঞ্চিত হলেও এবার আশার আলো দেখছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। গত দু’বার জোটের টিকিটে জাসদের মইন উদ্দীন খান বাদল এমপি হলেও এবার তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর সঙ্গে মইন উদ্দীন খান বাদলের বিরোধের কারণে আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী দেওয়ার সম্ভাবনা জোরালো হয়ে উঠেছে।

তৃণমূল আওয়ামী লীগ নেতাদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকার সারাদেশে উন্নয়ন করলেও সে তুলনায় বোয়ালখালীতে মইন উদ্দীন খান বাদল তেমন কোনো উন্নয়ন করতে পারেননি। আওয়ামী লীগের যে অংশটি এই জাসদ নেতার ছায়াসঙ্গী ছিলেন, সম্প্রতি তারাও সরে দাঁড়িয়েছেন।

তবে জোটগতভাবে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে গেলে শরিক দল হিসেবে মইন উদ্দিন খান বাদল এ আসনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হবেন- এমনটিই আশা করেছেন উপজেলা জাসদ নেতৃবৃন্দ।

কুয়েতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এস এম আবুল কালামের অনুসারীরা বিগত দিনে মইন উদ্দিন খান বাদলের ছায়াসঙ্গী ছিলেন। এবার তারা নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হিসেবে চাইছেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আবদুল কাদের সুজনকে। গত ২২ সেপ্টেম্বর উপজেলা ডাকবাংলোতে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তারা এ দাবি জানান।

এদিকে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে বোয়ালখালীতে মোসলেম উদ্দিন আহমদের অবস্থান অনেক সুদৃঢ় বলে অভিমত স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের। তাদের দাবি, দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমেদ উপজেলা আওয়ামী লীগের সক্রিয় নেতৃবৃন্দদের নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করছেন। তৃণমূলও আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে মোছলেম উদ্দিন আহমদকে চট্টগ্রাম-৮ আসনের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হিসেবে দেখতে চান।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবদুচ ছালামের হাত ধরে চট্টগ্রামে একাধিক মেগা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। নগর আওয়ামী লীগের অর্থবিষয়ক সম্পাদক ছালাম ২০০৮-এর নির্বাচনে এ আসন থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। তিনিও এ আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন চাইবেন বলে তার অনুসারীরা জানিয়েছেন। এছাড়া সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় এসেছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসির ছেলে মুজিবুর রহমানও।

দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি নেতারা বলছেন, সরকারের দমন-পীড়নের কারণে তারা বিগত সময়ে দলীয় কর্মকান্ড চালাতে পারেননি। সবকিছুই ছিল অনুষ্ঠাননির্ভর। তবে ভোটের রাজনীতিতে তারা দুর্বল নন। আওয়ামী লীগ সরকারের দুই দফা মেয়াদে বোয়ালখালী উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ও পৌর নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। এ ধারাবাহিকতা সংসদ নির্বাচনেও থাকবে।

আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী মোসলেম উদ্দিন বলেন, ধারাবাহিক উন্নয়ন কর্মকা-ের জন্য জনগণ আগামী দিনেও নৌকা প্রতীকে ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখবেন। আশা করি কেন্দ্র এবার জোট থেকে নয়, দল থেকে মনোনয়ন দিবে। স্থানীয় নেতা-কর্মী ও ভোটাররা আওয়ামী লীগের প্রার্থীকেই দেখতে চান।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম বলেন, গত দুই নির্বাচনে দলের প্রার্থী হওয়ার জন্য মনোনয়ন চেয়েছিলাম। মহাজোটের স্বার্থে সভানেত্রীর সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছিলাম এবং দলের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করি। এবারও মনোনয়ন প্রত্যাশা করছি। এক্ষেত্রে সভানেত্রীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

অপর সম্ভাব্য প্রার্থী দক্ষিণ জেলা শাখার তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আবদুল কাদের সুজন বলেন, ‘আমি তৃণমূল থেকে উঠে আসা আওয়ামী লীগের একজন কর্মী। নির্বাচন করার আগ্রহ আমারও রয়েছে।

বর্তমান সংসদ সদস্য মইন উদ্দীন খান বাদল বলেন, বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক সহযোগিতায় আমার সংসদীয় আসনে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকা- পরিচালিত হয়েছে। একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে চলছে। একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় নতুন কালুরঘাটে সড়ক কাম রেল সেতু প্রকল্প। এখানে আমি কী করেছি, জনগণ তার মূল্যায়ন করবেন। জোটের শরিক হিসেবে এ আসনের প্রার্থী আমি। আওয়ামী লীগ যদি এককভাবে নির্বাচন করে, তাহলে ভিন্ন কথা।

এদিকে বোয়ালখালী বিএনপির সভাপতি মোস্তাক আহমদ খান বলেন, এ আসনে কখনও আওয়ামী লীগ জয়ী হতে পারেনি। বোয়ালখালী বরাবরই বিএনপির দূর্গ। এ আসনে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম মোরশেদ খান ধানের শীষ প্রতীকের একক প্রার্থী। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ধানের শীষ প্রতীক বিপুল ভোটে জয়ী হবে।

নগর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আবু সুফিয়ান বলেন, মোরশেদ খান আমার নেতা। তিনি নির্বাচন না করলে সেক্ষেত্রে দলের মনোনয়ন চাইবো। ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত দলের সঙ্গে আছি, এলাকার মানুষের সঙ্গেই আছি। দলের নীতিনির্ধারক মহল যদি আমাকে যোগ্য মনে করে মনোনয়ন দেয়, তাহলে নির্বাচন করবো।

নগর বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এরশাদ উল্লাহ বলেন, ২০০৮ সালে দলের চরম দুঃসময়ে নির্বাচন করেছিলাম। এবারও মনোনয়ন চাইবো।

এ আসন থেকে ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের মো. কফিল উদ্দিন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালে নির্বাচিত হন বিএনপির সিরাজুল ইসলাম। ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টি থেকে এবং ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে বিএনপি থেকে এম মোরশেদ খান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। মাঝে ১৯৮৮ সালে জয়লাভ করেন জাতীয় পার্টির কামরুন নাহার জাফর।

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...