শুভ জন্মদিন ‘গুরু’

যতদিন তোরা আছিস, ততদিন আমি আছি

0

বাংলা রক গানের যুবরাজ জেমস। নাগরিক বাউলের বেশে যিনি চার দশক ধরে রক গানের পতাকা বহন করছেন আঙুল ছুঁয়ে গিটারে; বাংলার পথে পথে। কারো কাছে তিনি গুরু, কারো কাছে নগর বাউল! ভক্ত অনুরাগীদের এসব সম্বোধনকে তিনি ‘থুরাই কেয়ার’ করেন! আর তার এই মেজাজকেই পছন্দ সবার। কেননা গিটার ছুঁয়েই ভক্ত শ্রোতাদের উদ্দেশে তিনি অনায়াসে বলে উঠতে পারেন ‘তোমরাই আমার জান, তোমরাই আমার প্রাণ’! হ্রাসভারি কণ্ঠে যিনি বিশ্বের বুকে ছড়িয়ে থাকা কোটি তরুণকে বারংবার আশ্বস্ত করেছেন এই বলে- পথের বাপই বাপরে মনা/ পথের মা-ই মা/ পথের মাঝে খুঁজে পাবি আপন ঠিকানা…।

রবিবার (২ অক্টোবর) ৫৮ বছরে পা রেখেছেন এই রিয়েল রকস্টার। শুভ জন্মদিন বাংলা গানের রক নায়ক ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস।

উপমহাদেশের অন্যতম এই রকারের জন্ম ১৯৬৪ সালের এই দিনে নওগাঁয়। অথচ তার বেড়ে ওঠা এবং সংগীতে জড়িয়ে পড়ার পুরোটাই ঘটেছে পাহাড়কন্যা চট্টগ্রামে। সংগীতের বিকাশ ঘটেছে ঢাকায়। যদিও এখন তিনি আর সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। বলিউড জয়ের পর এখন তিনি বিশ্বজুড়ে সার্বজনীন।

জন্মদিনে এই তারকাকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে ভক্তদের উন্মাদনা আর আয়োজনের কমতি না থাকলেও, বরাবরের মতো এবারও নিজের মতো করে কাটাবেন জেমস। এদিনে তিনি রাখেন না কোনও কনসার্ট-রেকর্ডিং। পারতপক্ষে অংশ নেন না কোনও জন্মোৎসবের আয়োজনে। দিনটিতে নিজের মধ্যেই গুটিসুটিমেরে থাকতে পছন্দ করেন তিনি।

তবে ভক্তদের জন্য প্রতি জন্মদিনেই বিশেষ বার্তা পাঠান। এবার জন্মদিনের (২ অক্টোবর ২০২২) প্রথম প্রহরে (রাত ১২টা) তেমনই বার্তা দিলেন। ভক্তদের উদ্দেশ্যে জেমস বললেন, ‘যতদিন তোরা আছিস, ততদিন আমি আছি।’

সম্ভবত জানান দিলেন, জীবন খুব ছোট। যেতে হবে সবাইকে। আগে আর পরে। তবে একজন শিল্পী যুগান্তরের পথে যুবকের বেশে হেঁটে চলে তার ভক্তদের দৌলতে। তাই তো নগর বাউলের কণ্ঠে এবার সেই বার্তা- যতদিন তোরা আছিস, ততদিন আমি আছি। জন্মদিন একটি সংখ্যা মাত্র।

জেমস থেকে যাবেন বাংলায়, রক গানের সমৃদ্ধ ইতিহাসের পাতায়; এতে সন্দেহ নেই। তবে এখনও থেমে নেই ৫৮ বছরের এই যুবক। এখনও দেশ-বিদেশের সবচেয়ে দামি শো করেন তিনি। মাঝে নতুন গান থেকে লম্বা ছুটি নিলেও সম্প্রতি উদ্যোগ নিয়েছেন নিয়মিত গান প্রকাশের। তারই সূত্র ধরে গত ২ মে টানা ১২ বছর পর হাজির হন নতুন গানচিত্র ‘আই লাভ ইউ’ নিয়ে। সেই ধারাবাহিকতায় চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে আবারও আসছেন নতুন গান নিয়ে। এমনটাই নিশ্চিত করলেন নগর বাউল।

নগর বাউল ব্যবস্থাপক রুবাইয়াৎ ঠাকুর রবিন জানান, শিগগিরই নতুন গানের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।

এদিকে আজ (২ অক্টোবর) নগর বাউলের জন্মদিনকে ঘিরে দেশ ও বিদেশের শতাধিক ফ্যানক্লাবের পক্ষ থেকে রাখা হয়েছে নানা আয়োজন, যা প্রতি বছরই থাকে। এসব আয়োজনে ভক্তদের পক্ষ থেকে প্রতি বছরই থাকে অভিনব সব চমক। সেই ধারাবাহিকতায় এবার নড়র বাউলকে উদ্দেশ্য করে ‘গুরু তুমি অক্সিজেন’ নামের একটি গান প্রকাশ করেছেন ডালিম স্বাধীন নামের এক ভক্ত। যা অন্তর্জালে উন্মুক্ত হয়েছে শনিবার (১ অক্টোবর) দিবাগত মধ্যরাতে। যে গানের মাধ্যমে ভক্ত ডালিম তুলে ধরেছেন গুরুর প্রতি মুগ্ধতা।

নগর বাউল ভক্তদের হয়তো জানা তবুও কথার কথা, জেমসের বাবা ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। যিনি পরবর্তীতে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরিবারের অমতেই সংগীতচর্চা শুরু করেন জেমস। একসময় তিনি সংগীতের জন্য ঘর ছেড়ে পালিয়ে যান। উঠেন চট্টগ্রামের আজিজ বোর্ডিং-এ। সেখানে থেকেই তার সংগীতের মূল ক্যারিয়ার শুরু হয়।

১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ব্যান্ড ‘ফিলিংস’। ১৯৮৭ সালে প্রথম অ্যালবাম ‘ষ্টেশন রোড’ প্রকাশ পায়। ১৯৮৮ সালে ‘অনন্যা’ নামের একক অ্যালবাম প্রকাশ করে সুপার হিট হয়ে যান জেমস। এরপর ১৯৯০ সালে ‘জেল থেকে বলছি’, ১৯৯৬ ‘নগর বাউল’, ১৯৯৮ সালে ‘লেইস ফিতা লেইস’, ১৯৯৯ সালে ‘কালেকশন অব ফিলিংস’ অ্যালবামগুলো প্রকাশ পায়।

এরপর ‘ফিলিংস’ ভেঙে জেমস গড়ে তোলেন নতুন লাইনআপে ব্যান্ড ‘নগর বাউল’। এই ব্যান্ড ‘দুষ্টু ছেলের দল’ এবং ‘বিজলি’ অ্যালবাম দুটির মধ্যেই আটকে যায়। এরপর একক অ্যালবাম হিসেবে প্রকাশ করেন ‘দুঃখিনী দুঃখ করোনা’, ‘ঠিক আছে বন্ধু’, ‘আমি তোমাদেরই লোক’, ‘জনতা এক্সপ্রেস’, ‘তুফান’ এবং সর্বশেষ ‘কাল যমুনা’।

২০০৪ সালে কলকাতার সংগীত পরিচালক প্রিতমের সঙ্গে গান নিয়ে কাজ করেন জেমস। ২০০৫ সালে বলিউডে গ্যাংস্টার চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেন। চলচ্চিত্রে তার গাওয়া ‘ভিগি ভিগি’ গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় এবং এক মাসেরও বেশি সময় গানটি বলিউড টপচার্টের শীর্ষে ছিল।

২০০৬ সালে আবারও বলিউডের ছবিতে কণ্ঠ দেন। ২০০৭ সালে তিনি ‘লাইফ ইন এ মেট্রো’ চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেন। চলচ্চিত্রে তার গাওয়া গান দুটি হল রিশতে এবং আলবিদা। আর তাতেই বাজিমাত।

চলচ্চিত্রে সর্বশেষ এই শিল্পীকে ২০১৭ সালে ‘সত্ত্বা’ ছবিতে গাইতে দেখা যায়। এই ছবির ‘তোর প্রেমেতে অন্ধ আমি’ গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং সেই বছর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও অর্জন করে।

এদিকে শেষ অ্যালবাম প্রকাশের টানা এক যুগ পর চলতি বছর প্রকাশ পায় সিঙ্গেল ‘আই লাভ ইউ’।

জেমসের গাওয়া সেরা ১০ গানের মধ্যে, বাংলাদেশ, জেল থেকে আমি বলছি, মা, দুখিনী দুঃখ করো না, লেইস ফিতা লেইস, বাবা কতো দিন, বিজলী, দুষ্টু ছেলের দল, মিরাবাঈ, পাগলা হাওয়া, গুরু ঘর বানাইলা কী দিয়া উল্লেখযোগ্য।

জেএন/এও

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...