রেকর্ড পরিমাণ লবণ উৎপাদনেও দাম বাড়ল,কিন্তু কেন?

৩ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বাড়ল প্রতি কেজি প্যাকেটজাত লবণ

0

সাম্প্রতিক সময়ে মুদ্রাস্ফীতির জেরে এমনিতেই সাধারণ মানুষের পকেটে ভীষণ চাপ পড়েছে। নিত্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দাম গত কয়েক মাস ধরেই ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এবার দাম বাড়ল লবণের।

বাজারে এখন ফ্রেশ, কনফিডেন্স, পিউর, মোল্লা সল্ট, মুসকান, পূবালী, এসিআই, তীরসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত লবণ বাড়তি দামে বিক্রি করা হচ্ছে।

গতকাল মঙ্গলবার চট্টগ্রামের বিভিন্ন মুদি দোকান ঘুরে দেখা গেছে, উল্লিখিত ব্র্যান্ডের প্রতি কেজি প্যাকেটজাত লবণ ৩৮ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে, যা কয়েকদিন আগেও ৩৫ টাকায় এবং দেড় মাস আগে ছিল ৩২ থেকে ৩৩ টাকা।

সে হিসেবে গত কয়েকদিনের ব্যবধ্যানে প্যাকেটজাত প্রতি কেজি লবণে ৩ টাকা এবং গেল এক-দেড় মাসের ব্যবধানে প্যাকেটজাত আয়োডিনযুক্ত লবণের কেজিতে পাঁচ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বাজারে অধিকাংশ বিক্রেতা এখন মোড়কের গায়ের দামেই লবণ বিক্রি করেন।

অতচ গত মৌসুমে দেশে রেকর্ড পরিমাণ লবণ উৎপাদন হয়েছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশনের (বিসিক) তথ্যমতে, গত মৌসুমে লবণ উৎপাদন হয়েছে ১৮ লাখ টনের বেশি। যা এ যাবৎকালে সর্বোচ্চ। লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৩ লাখ ৫৭ হাজার টন।

রেকর্ড উৎপাদনেও দাম বেড়েছে প্যাকেটজাত লবণের। সাথে তাল মিলিয়ে প্রতি বস্তা খুচরা লবণের দামও বেড়েছে। দাম বাড়ার ফলে ভোক্তাদের ওপর পণ্যমূল্যের চাপ আরও বাড়বে।

পাইকারিতে ২৫ কেজির একটি বস্তা লবণের দাম আগে ছিলো ৭৫০ টাকা। এখন কিনতে হচ্ছে ৮০০ টাকায়। দুই মাসের কম সময়ে ২৫ কেজি লবণের বস্তায় দাম বেড়েছে ৫০ টাকা।

অতচ খোজ নিয়ে জানা গেছে মাঠ পর্যায়ে লবণের দাম বাড়েনি। এখনো প্রতি কেজি মাত্র ১১ টাকা। তাই পাইকারি ও খুচরা বাজারে লবণের দাম বাড়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

মাঠ পর্যায়ে দাম কম থাকার পরও প্যাকেটজাত লবণের দাম বাড়ানোর বিষয়টি একটু বেশি হয়ে গেল মন্তব্য করেছেন কক্সবাজারের বিসিক লবণ প্রকল্পের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) জাফর ইকবাল ভুঁইয়া।

তিনি বলেন, আগামী নভেম্বরে কুতুবদিয়া, রাজাখালী ও টেকনাফের মাঠে উৎপাদিত নতুন লবণ বাজারে আসবে। বর্তমানে মাঠে দেড় লাখেরও বেশি, মিলে দেড় লাখ এবং আমদানি করা দেড় লাখ মেট্রিক টনসহ কমপক্ষে পাঁচ লাখ মেট্রিক টন লবণ রয়েছে। সুতরাং উৎপাদন মৌসুম পর্যন্ত ঘাটতির আশঙ্কা নেই।

বাংলাদেশ লবণ মিল মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ৩০০-এর বেশি লবণ মিল রয়েছে। তার মধ্যে আধুনিক প্রযুক্তির মিল আছে হাতে গোনা ৫/৬টি। এগুলোর মধ্যে এসিআই, মোল্লা, ফ্রেশ, কনফিডেন্স ও এসএ সল্ট অন্যতম। মিলগুলোর অধিকাংশই চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও নারায়ণগঞ্জ এলাকায়।

উৎপাদনে ঘাটতি না থাকলেও জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। এ কারণে প্যাকেটজাত লবণের দাম বেড়েছে বলে জানান বাজারজাতকারী কোম্পানিগুলো।

তাছাড়া কোন কোন ব্যবসায়ী বলছেন, গত এক বছরে বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম ওঠানামা করলেও প্যাকেটজাত লবণের দামে তেমন পরিবর্তণ করা হয়নি। এখন বাজারে প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণে গত মাসের শুরু থেকে প্যাকেটজাত লবণের দাম কিছুটা বেড়েছে।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যমতে, গত এক মাসের ব্যবধানে প্যাকেটজাত লবণের দাম বেড়েছে ১০ দশমিক ৬১ শতাংশ।

দাম বাড়ানোর বিষয়ে মোল্লা সল্টের মহাব্যবস্থাপক মান্নান মোল্লা বলেন, বাজারে সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়ায় প্যাকেটজাত লবণের দাম সমন্বয় করা হয়েছে।

এসিআইয়ের বিপণন পরিচালক কামরুল হাসান বলেন, ‘আমরা ঢাকায় ক্রুড লবণ কিনছি প্রতি মণ ৫০০ টাকা দরে। তার ওপর ১০০ কেজি লবণকে ভ্যাকুয়াম লবণে পরিণত করতে গিয়ে পাওয়া যায় মাত্র ৫৮ থেকে ৬০ কেজি। এ ঘাটতি মেটাতে গিয়ে দাম বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।

তিনি বলেন, আয়োডিন ও নানা কেমিক্যাল ব্যবহারেও অতিরিক্ত খরচ বেড়ে গেছে। সব মিলিয়ে এক কেজি লবণ প্যাকেট করতেই খরচ পড়ছে ৩২ টাকা। তবে লবণের দাম কমলে প্যাকেটজাত লবণের দাম কমানো হবে বলে জানান তিনি।

এদিকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন মিল মালিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে মিল পর্যায়ে লবণের দাম বাড়েনি। এখনো ১০ থেকে সর্বোচ্চ ১২ টাকা কেজি দরে লবণ বিক্রি করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ লবণ মিল মালিক সমিতির সহসভাপতি আবু হানিফ ভূঁইয়া বলেন, মিল পর্যায়ে বেশ কয়েক বছর ধরেই লবণের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। দাম বাড়ানো হয়নি। তবে যেসব কোম্পানি প্যাকেটজাত করে লবণ বাজারজাত করছে, তারা হয়তো বর্তমান অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় দাম সমন্বয় করছে।

জানা গেছে, দেশে তিন ধরনের লবণ রয়েছে বাজারে। ভ্যাকুয়াম লবণ, মেকানিক্যাল লবণ ও অর্গানিক লবণ। ভ্যাকুয়াম পদ্বতিতে লবণকে প্রথমে পানির মতো গলিয়ে ফেলা হয়। পরে আধুনিক মেশিনে দিয়ে সাদা লবণ প্যাকেটজাত করা হয়।

এ পদ্ধতিতে কেমিক্যাল ও আয়োডিন ব্যবহার করা হয়। মেশিনে ক্রাশের পর প্যাকেটজাত করে বিক্রি করা হয় মেকানিক্যাল লবণ।

আর হাতে পরিষ্কার করে যেটি প্যাকেটজাত করা হয়, সেটি অর্গানিক লবণ। বর্তমানে প্রতি কেজি ভ্যাকুয়াম লবণের দাম ৩৮ টাকা, মেকানিক্যাল লবণ ২৮ টাকা ও অর্গানিক ১৫ টাকা।

জেএন/পিআর

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...