চতুর ‘এসপি’ বাবুল আকতারের ‘অচতুর কিলিং মিশন’

বাবুল ফেঁসেছে ফোন রেকর্ডে

0

জঙ্গি ও সন্ত্রাস দমনে বেশ প্রশংসা কুড়িঁয়েছিলেন সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) বাবুল আক্তার। পেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পুরস্কারও। প্রযুক্তির দক্ষতার মাধ্যমে অপরাধীদের গ্রেফতার তাঁর জন্য মামলি ব্যাপার ছিল।

ক্লু-লেস মামলার জট খোলা থেকে শুরু করে কঠিন সব মামলার সুরহা করার জন্য তিনি প্রশংসিত ছিলেন পুলিশ বিভাগে। চতুর-দক্ষ এমন একজন পুলিশ কর্তা দাম্পত্য জীবনে তেমন সফল ছিলেন না।

আর এ অসুখী দাম্পত্য জীবনের ইতি টানটেই ‘স্ত্রীকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার মিশন’ ছিল এ চতুর অফিসারের অচতুর সিদ্বান্ত ছিল। স্ত্রী মাহমুদা খানম মিত্যু হত্যা মামলার বিস্তারিত তথ্য নিয়ে এ বিশেষ প্রতিবেদন। প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন জয় নিউজ এর বিশেষ প্রতিনিধি।

মিত্যু হত্যা  :

২০১৬ সালের ৫ জুন সকাল ৭ টা ১৭ মিনিটে চট্টগ্রাম নগরীর জিইসি মোড়ে ছেলেকে স্কুল বাসে তুলে দিতে যাওয়ার সময় মোটরসাইকেলে করে তিন দুর্বৃত্ত মিতুকে ঘিরে ধরে প্রথমে গুলি করে। এরপর কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়।

ওই সময় মিতুর স্বামী বাবুল আক্তার পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি পেয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে যোগ দিয়ে ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। তার আগে তিনি চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনারের দায়িত্বে ছিলেন।

হত্যাকান্ডের পর নগরীর পাঁচলাইশ থানায় অজ্ঞাতদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন বাবুল আক্তার। নগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাত ঘুরে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে বাবুল আক্তারের দায়ের করা মামলার তদন্তভার পড়ে পিবিআইয়ের ওপর।

এরপর আস্তে আস্তে জট খুলতে থাকে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টিকারী চাঞ্চল্যকর এই মামলার। ২০২১ সালের ১১ মে বাবুল আক্তারকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পিবিআই।

তদন্তে বাবুল আক্তারের সম্পৃক্ততা পাওয়ায় তার বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের লক্ষ্যে ১২ মে ওই মামলার ৫৭৫ পৃষ্ঠার চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেয় পিবিআই। এরপর নিহত মিতুর পিতার দায়ের করা অপর একটি মামলায় বাবুল আক্তারসহ বেশ কয়েকজনকে আসামি করা হয়। ওই মামলায় বাবুল আক্তার এখন ফেনী কারাগারে আছেন।

বাবুলের পরকীয়ায় মিতু খুন : 
মাহমুদা খানম (মিতু) হত্যার ঘটনায় তার স্বামী সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) বাবুল আক্তারসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে যে হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে সেখানে হত্যার কারণ হিসেবে পরকীয়া সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে।

পাঁচলাইশ থানায় মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেনের দায়ের করা মামলাটি রেকর্ড করা হয়। মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২, ১০৯ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্তের পর বাবুলসহ সাতজনকে আসামি করে অভিযোগপত্র তৈরি করা হয়েছে। আগামী সপ্তাহে বিবিআই আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিতে পারেন।

অভিযোগপত্রে নাম আসা ছয় আসামিরা হলেন- মো. কামরুল ইসলাম সিকদার ওরফে মুসা (৪০), এহতেশামুল হক ওরফে হানিফুল হক ওরফে ভোলাইয়া (৪১), মো. মোতালেব মিয়া ওরফে ওয়াসিম (২৭), মো. আনোয়ার হোসেন (২৮), মো. খায়রুল ইসলম ওরফে কালু (২৮), সাইদুল ইসলাম সিকদার (৪৫) ও শাহজাহান মিয়া (২৮)।

হত্যার কারণ তুলে ধরে এজাহারে উল্লেখ করা হয়, বাবুল আক্তার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে কক্সবাজার জেলায় চাকুরি করাকালীন ইউএনএইচসিআরের ফিল্ড অফিসার (প্রোটেকশন) গায়ত্রী অমর শিং এর সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন।

এতে আমার মেয়ের পরিবারে চরম অশান্তি দেখা দেয়। বাবুল আক্তার পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ায় প্রতিবাদ করলে আমার মেয়ে মিতুকে বিভিন্ন সময় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতে থাকে।

২০১৪ সালের জুলাই থেকে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত বাবুল আক্তার সুদানে মিশনে কর্মরত থাকাকালীন তার ব্যবহার করা মোবাইল নম্বর চট্টগ্রামের বাসায় রেখে গেলে গায়ত্রী ওই নাম্বারে বিভিন্ন সময় ২৯ বার বিভিন্ন ম্যাসেজ দেন।

এই ম্যাসেজগুলো আমার মেয়ে মিতু তার একটি খাতায় নিজ হাতে লিখে রাখে। সর্বশেষ হত্যাকাণ্ডের ঘটনার কয়েকমাস আগে বাবুল আক্তার চায়নাতে ট্রেনিংয়ে গেলে আমার মেয়ে গায়ত্রীর উপহার দেয়া ‘তালেবান’ ও বেস্ট কিপ্ট সিক্রেট’ নামক দুটি বই খুঁজে পায়। বাবুল আক্তারের প্রেমিকা গায়ত্রী

উক্ত দুটি বইয়ের তালেবান নামক বইয়ের তৃতীয় পাতায় গায়ত্রীর নিজ হাতে ইংরেজিতে লেখা আছে, “০৫/১০/১৩, Coxs Bazar, Bangladesh. hope the memory of m offering you this personal gift, shall eterrnalizeour wonderful bond, love you, Gaitree.

একই বইয়ের শেষ পৃষ্টা ২৭৬ এর পরের পাতায় বাবুল আক্তারের নিজের হাতে ইংরেজিতে গায়ত্রীর সাথে সাক্ষাতের কথা লেখা আছে। তিনি লিখেছেন, First meet: 11 sept, 2013, First PR in Cox. 07 oct 2013. G Birth Day, 10 Octobar, First kissed 05, Oct 2013; First beach walk: 8th Oct 2013, 11 Oct 2013, Marmaid with family, 12 oct 2013, Temple Ramu prayed togather, 13 oct 2013; Ramu Rubber Garden Chakaria night beach walk.

এছাড়া বেস্ট কিপ্ট সিক্রেট নামক বইয়ের প্রথম দিকের দ্বিতীয় পাতায় গায়ত্রীর নিজ হাতে ইংরেজিতে লেখা আছে, “৫/১০/২০১৩ with my sincere Love Yours Gaitree.

এজাহারের শেষের দিকে আরও লেখা হয়েছে, উল্লেখিত ঘটনার প্রেক্ষিতে উভয়ের মধ্যে পারিবারিক অশান্তি চরমে পৌঁছে। বাবুল আক্তারের এ ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডে আমার মেয়ে মিতু প্রতিবাদ করলে তার উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে। এই নির্যাতনের বিষয়টি আমার মেয়ে মিতু আমাদেরকে জানায়।

গায়ত্রীর ব্যাপারে ধর্না জাতিসংঘের সংস্থায় :
বাবুল আকতারের প্রেমিকা ভারতীয় নাগরিক গায়ত্রী অমর সিং সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থাকে (ইউএনএইচসিআর) চিঠি দিয়েছে মিতু হত্যা মামলার তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গত বছরের ২৫ মে মামলার সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক সন্তোষ কুমার চাকমা চিঠি দেন।

বাবুল ফেঁসেছে ফোন রেকর্ডে :
মাত্র ২৭ সেকেন্ডের একটি ফোন রেকর্ডে স্ত্রী হত্যা মামলায় বাবুল আকতার ফেঁসে যেতে পারেন বলে ধারণা করছে আইনবিদরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইতিপূর্বে মামলার তদন্তে সংশ্লিষ্ট থাকা একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ২০১৬ সালের ৫ জুন সকাল ৭ টা ৩৭ মিনিটে মিতু হত্যা মামলার প্রাইম সাসপেক্ট মুছার মোবাইল ফোনে তৎকালীন এসপি বাবুল আক্তারের মোবাইল ফোন থেকে একটি কল যায়। বাবুল আক্তারের প্রেমিকা গায়ত্রী

কল রিসিভ করে মুছা সালাম দিতেই অপর প্রান্ত থেকে বাবুল আক্তার বলেন, ‘তুই কোপালি ক্যান?’ কয়েক সেকেন্ড থেমে আবারো বাবুল আক্তার উত্তেজিত কন্ঠে বলে উঠেন, ‘বল তুই কোপালি ক্যান ? তোরে কোপাতে কইছি ?’ এরপর অনেকটা থতমত খেয়ে মুছা আমতা আমতা করে বলেন, ‘না মানে….’। এরপর পরই বাবুল আক্তার কলটি কেটে দেন।

বলা হয় সেই ২৭ সেকেন্ড কলের কথোপথনের রেকর্ড পেয়েই হত্যাকান্ডের ১৯ দিন পর ২০১৬ সালের ২৪ জুন রাতে বনশ্রীর শ্বশুরের বাসা থেকে বাবুলকে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে প্রায় ১৪ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তার কিছু দিন পর বাবুল আক্তার পুলিশের চাকরি ছেড়ে দেন।

মুছা গুম :
ঘটনার পর থেকে মুছার কোন হদিস মেলেনি। মুছা পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের সোর্স হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পাঁচ বছর আগে হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই পলাতক আছেন কামরুল ইসলাম সিকদার মছসা।

তবে তার স্ত্রী পান্না আক্তারের দাবি, মুছাকে ওই বছরের ২২ জুন প্রশাসনের লোকজন তুলে নিয়ে যায়। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ মিলছে না। যদিও পুলিশ বলছে মুছা পলাতক।

ইতিমধ্যে অভিযুক্ত মুছাকে ধরিয়ে দিতে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। এই হত্যাকান্ডে সন্দেহভাজন দুই আসামী নূরুন্নবী ও রাশেদ পুলিশের বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। এছাড়া অন্যতম অভিযুক্ত ভোলা জামিনে আছেন।

বিকাশ নম্বরে মুছাকে দেওয়া হয় ৩ লাখ টাকা :
মাহমুদা খানম মিতু হত্যা মামলায় সাক্ষী হিসেবে ২০২১ সালের ২৫ মে মোকলেসুর রহমান ইরাদ নামে একজন চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম মো. শফী উদ্দিনের আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। ইরাদ বাবুল আক্তারের পূর্বপরিচিত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ও ব্যবসায়িক অংশীদার সাইফুল হকের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক।

মিতুকে খুনের ঘটনায় ‘কিলিং মিশনের প্রধান’ হিসেবে অভিযুক্ত মো. কামরুল ইসলাম শিকদার মুছার দেওয়া বিকাশ নম্বরে হত্যাকান্ডের পাঁচ দিন পর ইরাদ তিন লাখ পাঠানোর কথা জবানবন্দিতে স্বীকার করেছেন।বাবুল আক্তারের প্রেমিকা গায়ত্রী

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কর্মকর্তারা বলেন, সাইফুল হকের নির্দেশে হত্যাকাণ্ডের পাঁচ দিন পর মুছার দেওয়া একটি বিকাশ নম্বরে ইরাদ মোট তিন লাখ টাকা পাঠান। পাবনায় সাইফুল হকের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ইরাদও পাবনার বাসিন্দা।

এর আগে, ২০২১ সালের ১১ মে সাইফুল হক ও গাজী আল মামুন নামে দু’জন ব্যক্তি মিতু হত্যায় দায়ের হওয়া আগের মামলায় একই আদালতে জবানবন্দি দিয়েছিলেন।

বাবুল আক্তারের পূর্বপরিচিত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি এবং ব্যবসায়িক অংশীদার সাইফুল হক জবানবন্দিতে জানিয়েছিলেন, মিতু হত্যার তিন দিন পর তিনি বাবুল আক্তারের নির্দেশে গাজী আল মামুনের মাধ্যমে মো. কামরুল ইসলাম শিকদার মুসার কাছে তিন লাখ টাকা পাঠান। গাজী আল মামুন সেই মুসার আত্মীয়। মামুনও জবানবন্দি দিয়ে টাকা লেনদেনের বিষয়টি স্বীকার করেন।

পিবিআই জানিয়েছিল, বাবুল আক্তারের ঘনিষ্ঠজনের জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের পর টাকা লেনদেনের তথ্যপ্রমাণ পাওয়ার পরই পিবিআই নিশ্চিত হয়, মিতুকে হত্যার জন্যই মূলত এই তিন লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে।

বাবুল আক্তারের পরিকল্পনায় এটি ছিল একটি কন্ট্রাক্ট কিলিং। মূলত বাবুল আক্তারই টাকা পাঠানোর জন্য সাইফুলকে নির্দেশ দিয়েছিলেন।

জেএন/এফও/পিআর

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...