ভয়-আতঙ্কে পথচারী: ঝুঁকি নিয়ে চলছে যানবাহন

চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে

0

চট্টগ্রাম নগরীতে যানজট নিয়ন্ত্রন এবং অভ্যন্তরে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে নির্মিত হচ্ছে প্রায় সাড়ে ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে।

২০১৭ সালের জুলাই মাসে একনেক সভায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প অনুমোদন পায়। বিভিন্ন জটিলতা কাটিয়ে ২০১৯ সালে নির্মাণ কাজ শুরু করে সিডিএ।

চট্টগ্রাম বন্দরের আপত্তি, জমি অধিগ্রহণের জন্য অপেক্ষা, ট্রাফিক বিভাগের অনুমতি না পাওয়া, লালখান বাজার অংশের নকশা নিয়ে আপত্তি ও বিকল্প সড়ক চালু করতে দেরিসহ নানা কারণে প্রকল্পটি বিলম্বিত হয়।

সম্প্রতি সকল প্রতিকুলতা পার করে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ কাজ। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) বলছে, সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের শেষ দিকে অথবা আগামী বছরের প্রথম দিকে এ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ১০ কিলোমিটার সড়ক খুলে দেয়া হবে যান চলাচলের জন্য।

জানা গেছে, টাইগারপাস থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ কাজ করছে সিডিএ। নগরীর মাঝখান দিয়ে গিয়ে এক্সপ্রেসওয়েটির এক প্রান্ত লালখানবাজারের উড়ালসড়কের সাথে যুক্ত হবে। অপর প্রান্ত যুক্ত হবে কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে নির্মিত বঙ্গবন্ধু টানেলের সাথে। ট্রাফিক পুলিশের হিসেবে ছোট-বড় মিলিয়ে দৈনিক অন্তত ১৮ হাজার যানবাহন চলাচল করে ব্যাস্ততম সড়কটিতে।

প্রকল্প কাজের ধীরগতি ও জনদুর্ভোগ : প্রায় ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে পতেঙ্গা-লালখানবাজার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে।যান চলাচলের উপযোগী হচ্ছে সরকারের অগ্রাধিকার এ প্রকল্পটির একাংশ। তবে বিপত্তি অন্য অংশে। বারবার সময় ও ব্যয় বাড়ায় প্রভাব পড়েছে পুরো প্রকল্পে। ভোগান্তি বেড়েছে জনগণের।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বড় এই প্রকল্প বাস্তবায়নে যে পরিমান নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার করার কথা, তেমন কিছুই চোখে পড়ছে না। মূল সড়কের মধ্যখানে নির্মাণ কাজ চলছে। কোথাও কোথাও টিনের ব্যারা থাকলেও বেশিরভাগ এলাকা অরক্ষিত। ব্যস্ত সড়কে উন্মুক্ত অবস্থায় সাধারণ যানবাহনের সঙ্গেই ব্যবহার করা হচ্ছে নির্মাণ কাজে নিয়োজিত ক্রেন, এক্সেভেটরের মতো ভারী যন্ত্রাংশ। কোথাও সড়কের মাঝেই গর্ত।

দুই পাশে সড়কের অনেক অংশে দেখে মনে হবে যেনো খানা-খন্দকে ভরা কোনো যুদ্ধ বিধ্বস্থ এলাকা। এই সড়ক পথে প্রতিদিন হাজার হাজার বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যানসহ বিভিন্ন ধরনের গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল করছে মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে। প্রতিদিনই ছোট-বড় দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে যানবাহন। অপরদিকে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থেকে সাধারণ ব্যবসায়ী ও কর্মজীবি মানুষের নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা।

বিশেষজ্ঞমহলের মন্তব্য : চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার ধসে প্রাণহানি এবং সম্প্রতি ঢাকা উত্তরার ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিয়ে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ দেলোয়ার হোসেন মজুমদার বলেন, ‘রাস্তার মাঝখানে কাজ চলায় দুর্ঘটনার প্রবণতা থেকেই যায়। অতচ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলতা আর তদারকি প্রতিষ্ঠানের সামান্য আন্তরিকতা থাকলেই মর্মান্তিক সব দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব ।

ভয় আতঙ্কের সড়ক : নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়েই নির্মাণ কাজ চলছে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা-লালখানবাজার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে সড়কে। পথচারীদের অভিযোগ, নির্মাণকাজে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বাউন্ডারি, সেফটিনেটের মতো অপরিহার্য সরঞ্জাম চোখেই পড়ছে না। উন্মুক্ত সড়কে সাধারণ যানবাহনের সঙ্গে চলছে ক্রেন, এক্সেভেটরের মতো ভারী নির্মাণ সামগ্রী।ভয়-আতঙ্কে পথচারী ঝুঁকি নিয়ে চলছে যানবাহন

পাশেই  ইপিজেড, বন্দর–কাস্টমস থাকায় কর্মজীবী ও ব্যবসায়ীরা সবসময় ভয় আতঙ্ক আর বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশংকা নিয়েই এই সড়কে চলাচল করছে। তাছাড়া শতশত যানবাহন চলছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার উত্তরায় ফ্লাইওভারের গার্ডার ধসে প্রাণহানির ঘটনায় আতঙ্ক বেড়েছে পতেঙ্গা লালখানবাজার সড়ক ব্যবহারকারীদের।

সড়ক ব্যবহারকারী সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া : পতেঙ্গা-লালখানবাজার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে সড়কের নিমতলা-কাস্টমসের মাঝামাঝি অংশে রাস্তায় হাটছিলেন মিল্টন খন্দকার নামে নগরীর কাস্টমস এলাকার এক বাসিন্দা। সড়ক জুড়ে তখন দীর্ঘ যানজট। আক্ষেপ করে পাশে থাকা ব্যক্তিকে বলছিলেন, নির্মাণ কাজ কখন শেষ হবে আর এ যন্ত্রণা থেকে কবে মুক্তি পাবো?

তখন পাশে থাকা মধ্য বয়সী ব্যক্তিটি বলে উঠেন, এ সড়কে পা রাখলেই মনে পড়ে যায়, ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বরে বহদ্দারহাটে নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের গার্ডার ধসে প্রাণহানির ঘটনাটি। তবে উপায় না পেয়েই এ সড়কে চলাচল করতে হচ্ছে। সবসময় ভয়ে থাকি কখন ভেঙ্গে পড়ে।

হায়াত উল্লাহ নামে এক সিএনজি চালক জানায়, বহদ্দারহাটের ঘটনা আমি চোখে দেখেছি। এখনো আমাকে কাঁদায়।এ সড়কে গাড়ি নিয়ে প্রবেশ করতেই সে ভয়ংকর দিনটির কথা মনে পড়ে।নির্মাণ কাজ এলাকা দিয়ে গাড়ি চালাতে প্রতিটা মুহূর্তে রিস্কের মধ্যে থাকি। তারপরও পেটের দায়ে যাত্রী নিয়ে যেতে হয়।

মনিরুজ্জামান ভুঁইয়া নামে অপর এক ট্রাক চালক জানায়, অনেক ঝুঁকি নিয়ে এ পথে চলাচল করতে হয়। বিকল্প একটি পথে যাতায়াতের ব্যবস্থা করে রাতের বেলা সড়কটি বন্ধ করে দিয়ে কাজ করলে দুর্ঘটনার প্রবণতা কমে আসবে বলে মনে করেন এ চালক।

সিডিএর দাবী সতর্কতার সাথেই কাজ চলছে : এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান সিডিএ বলছে, পতেঙ্গা থেকে লালখানবাজার পর্যন্ত সাড়ে ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই উড়ালসেতুর নির্মাণকাজ চলছে সতর্কতার সঙ্গে। অর্ধেক অংশের কাজ শেষ হয়েছে। নির্মাণ কাজে আধুনিক যন্ত্রাংশ ব্যবহার আর জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে তাগিদ দেয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।

সিডিএর প্রধান এ প্রকৌশলী বলেন, গার্ডারগুলো একটি ভিন্ন জায়গায় তৈরি করি। সাড়ে ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ৩৭৫টি স্প্যানের ওপর ৩ হাজার গার্ডার বসানোর কাজ চলছে। এরইমধ্যে পতেঙ্গা অংশে গার্ডার বসানো প্রায় সম্পন্ন হয়েছে।

তিনি বলেন, রাত ১২টার পর আমরা গার্ডারগুলো বসায়। বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি আমরা ব্যবহার করছি। এরপরও সড়ক ব্যবহারকারী পরিবহন চালক ও পথচারীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন সিডিএর এই কর্মকর্তা।

শীঘ্রই খুলে দেওয়া হবে ১০ কিলোমিটার : সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের ডিসেম্বরে অথবা আগামী বছরের প্রথম দিকে যান চলাচলের জন্য এ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ১০ কিলোমিটার খুলে দেয়া হবে । তিনি বলেন, ভবিষ্যতে কর্ণফুলী টানেল চালু হওয়া ও বন্দরকেন্দ্রিক যানবাহনের চাপের কথা বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ।

পরিকল্পনা অনুযায়ী এবছর টানেলটি চালু হলে বিমানবন্দর সড়ক সহ নগরীর সব সড়কে বাড়বে যানবাহনের চাপ। তা সামাল দিতে বন্দর, ওয়াসা ও রেলওয়েসহ সকল সরকারি সেবা সংস্থার সাথে সমন্বয় করে দ্রুত কাজ এগিয়ে নেয়া হচ্ছে বলে জানালেন প্রকল্প পরিচালক।

জেএন/পিআর

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...